অনেকেই মনে করেন, এয়ারক্রাফট মেইনটেনেন্স ইঞ্জিনিয়ারিং (AME) মানে বিলাসবহুল জীবন, বিদেশে চাকরি, আর রোমাঞ্চকর ক্যারিয়ার। আসলে, হ্যাঁ — এই ফিল্ডে এমন সুযোগ সত্যিই আছে। তবে দুঃখজনকভাবে, অনেকেই সঠিকভাবে না জেনে ভুল পথে পা বাড়ান এবং কয়েক বছর সময় নষ্ট করে ফেলেন। আমি নিজেও একজন AME শিক্ষার্থী, তাই বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সহজ ভাষায় পুরো প্রক্রিয়াটা ব্যাখ্যা করছি — যাতে তুমি বুঝে, পরিকল্পনা করে, এবং সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারো।
এয়ারক্রাফট মেইনটেনেন্স ইঞ্জিনিয়ার আসলে কে? বিমান একটি জটিল মেশিন, যা নিরাপদে আকাশে উড়তে হলে নিয়মিত যত্ন ও পরীক্ষা প্রয়োজন — যেমন একজন ডাক্তার রোগীর যত্ন নেন। এই যত্ন, মেরামত ও পরিদর্শনের কাজ যারা করেন, তারাই Aircraft Maintenance Engineer (AME)। তাদের মূল দায়িত্ব হলো: বিমানের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করা সমস্যা চিহ্নিত ও মেরামত করা এবং নিশ্চিত করা যে বিমান উড্ডয়নের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ বিমান উড়ার আগে যিনি অনুমোদন দেন বা “সাইন অফ” করেন, তিনি Licensed Aircraft Maintenance Engineer। তাঁর সিগনেচার ছাড়া কোনো বিমান উড্ডয়ন করতে পারে না।
অন্যদিকে, যারা কাজ জানেন কিন্তু এখনো লাইসেন্স পাননি, তারা Unlicensed Engineer নামে পরিচিত। তাই লক্ষ্য সবসময় হওয়া উচিত — Licensed AME হওয়া।
কিভাবে AME ক্যারিয়ার শুরু হয়? মূলত দুটি পথে এই ক্যারিয়ার গড়া যায়
—পদ্ধতি ১: গ্র্যাজুয়েশন করে লাইসেন্স পাওয়ার পথ এটি অনেকটা “দীর্ঘ কিন্তু নিরাপদ পথ”। ধাপগুলো হলো:
- প্রথমে Aircraft Maintenance Engineering বা Aeronautical Engineering-এ গ্র্যাজুয়েশন করো।
- তারপর সব লাইসেন্সিং মডিউল পরীক্ষা দাও (এই পরীক্ষাগুলো নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক, যেমন বিমান কাঠামো, ইঞ্জিন, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদি)।
- এরপর প্রায় ৫ বছর On-Job Training (OJT) করতে হয় — মানে বাস্তবে কাজ করে শেখা। এই সময়ে একটি লগবুক পূরণ করতে হয় যেখানে কাজের বিস্তারিত লেখা থাকে।
- সবশেষে তুমি বেসিক লাইসেন্স পাবে।
- তারপর তোমাকে একটি নির্দিষ্ট বিমান মডেল নিয়ে Type Rating Course করতে হবে (যেমন Boeing 737 বা Airbus A320)।
- এরপর পাবে সাইনিং অথরিটি — মানে এখন তুমি নিজের সিগনেচারে বিমান সাইন-অফ করতে পারবে ।
এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গড়ে ১১–১৫ বছর লাগে। এটি ধীর কিন্তু স্থিতিশীল ক্যারিয়ার পথ।
–পদ্ধতি ২: সরাসরি EASA Part-147 কোর্স — দ্রুত ও কার্যকর পথ
এই পদ্ধতিতে এইচএসসি শেষ করার পরই সরাসরি বিমান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রবেশ করা যায়। EASA মানে European Union Aviation Safety Agency — এটি ইউরোপের সবচেয়ে বড় বিমান নিরাপত্তা সংস্থা। তাদের অনুমোদিত কোর্সের নাম Part-147।
এই কোর্সে যা থাকে:
- প্রায় ২ বছর ক্লাস ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ তত্ত্ব (থিওরি) এবং বাস্তব প্রশিক্ষণ (প্র্যাকটিক্যাল) একসাথে বিমান, ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক সিস্টেম ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ শেখানো হয়
- এরপর ধাপগুলো হলো: ২ বছরের OJT
- তারপর বেসিক লাইসেন্স
- এরপর Type Rating সবশেষে সাইনিং অথরিটি
এই পথে একজন পূর্ণাঙ্গ Licensed Engineer হতে সময় লাগে মাত্র ৪–৬ বছর! অর্থাৎ আগের পদ্ধতির তুলনায় অনেক দ্রুত।
যদি তুমি আগে থেকেই Aviation বা Forces-এ কাজ করো যদি তুমি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, নেভি, আর্মি এভিয়েশন বা কোনো এয়ারলাইনে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করো, তাহলে তুমি অনেক এগিয়ে আছো। কারণ, তোমার কাজের অভিজ্ঞতা OJT সময় কমিয়ে দেয়। Part-147 কোর্স সম্পন্ন করে যদি সঠিকভাবে তোমার লগবুক ও প্রমাণপত্র জমা দাও, তাহলে তোমার OJT সময় ২ বছর নয়, মাত্র ৪–১২ মাসেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
প্রতিটি দেশের নিজস্ব লাইসেন্সিং অথরিটি আছে:
–বাংলাদেশ – CAAB (Civil Aviation Authority of Bangladesh) 🇺🇸 আমেরিকা – FAA (Federal Aviation Administration)
–অস্ট্রেলিয়া – CASA (Civil Aviation Safety Authority)
তবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য হলো EASA লাইসেন্স (Europe)। এই লাইসেন্স থাকলে তুমি সহজেই ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, এমনকি অস্ট্রেলিয়ায়ও কাজ করতে পারবে।
কোথায় EASA Part-147 কোর্স করা যায়?
দুঃখের বিষয়, এখনো বাংলাদেশে কোনো EASA অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নেই। তাই বিদেশে যেতে হয়। জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে:
AST (Air Service Training, UK)
এয়ারক্রাফট মেইনটেনেন্স ইঞ্জিনিয়ার হতে কত টাকা লাগবে
Aviation Australia এই দুটি প্রতিষ্ঠানে ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। তাদের কোর্সের মান খুব উচ্চমানের, আর চাকরির সুযোগও অনেক বেশি। হ্যাঁ, খরচ তুলনামূলক বেশি, কিন্তু এর রিটার্ন বা ফলাফল অনেক বড় — কারণ একবার লাইসেন্স পেলে পুরো বিশ্ব তোমার কর্মক্ষেত্র।