অনেক শিক্ষার্থীই জানতে চান— এয়ারক্রাফট মেইনটেনেন্স ইঞ্জিনিয়ারিং (পার্ট ১৪৭) কোর্সটি করতে কত খরচ হয়, কোথায় করলে ভালো হয়, এবং ভবিষ্যতে এর ক্যারিয়ার সম্ভাবনা কেমন। সত্যি বলতে, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেওয়া সহজ নয়, কারণ প্রতিটি শিক্ষার্থীর লক্ষ্য, প্রস্তুতি এবং পরিস্থিতি একে অপরের থেকে ভিন্ন। তবে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি যেভাবে নিজে রিসার্চ করেছি এবং বর্তমানে যা অভিজ্ঞতা অর্জন করছি, তার ভিত্তিতে বাস্তব ও তথ্যনির্ভর একটি ধারণা শেয়ার করার চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশে পড়লে কেমন? আপনি যদি বাংলাদেশের মধ্যে কাজ করার পরিকল্পনা করেন — অর্থাৎ দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাহলে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে এখন বেশ কিছু Civil Aviation Authority of Bangladesh (CAAB) অনুমোদিত ইনস্টিটিউশন আছে, যারা এই কোর্সটি পরিচালনা করছে। গুগলে সার্চ দিলেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। খরচও তুলনামূলকভাবে এফোর্ডেবল, মানে সাধ্যের মধ্যে।
আপনি যদি গ্লোবাল লেভেলে কাজ করতে চান, তাহলে দরকার হবে EASA (European Union Aviation Safety Agency) অনুমোদিত লাইসেন্স। দুঃখজনকভাবে, এখনো বাংলাদেশে কোনো EASA অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নেই, তাই এই কোর্স করতে হলে দেশের বাইরে যেতে হবে। অনেক দেশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এই কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়, যেমন — চীন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, হংকং, ও নিউজিল্যান্ড। আমি নিজে যখন কোর্স খুঁজছিলাম, তখন এই দেশগুলোর টিউশন ফি, কোর্স ক্রাইটেরিয়া, ও লাইফস্টাইল নিয়ে বিস্তারিত তুলনা করেছিলাম। আমার কাছে হংকং, চীন, মালয়েশিয়া এবং ইংল্যান্ডের টিউশন ফি অনেক বেশি মনে হয়েছে। তাছাড়া, ওই দেশগুলোতে নতুন স্টুডেন্টদের জন্য সারভাইভ করাটাও কঠিন।
সবদিক বিবেচনা করে আমি অস্ট্রেলিয়াকে বেছে নিয়েছি। এখানে এই কোর্সের টিউশন ফি তুলনামূলকভাবে কম এবং সবচেয়ে বড় কথা — পুরো দেশে এই কোর্সটি শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানই অফার করে, সেটি হলো Aviation Australia। এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারি অনুমোদিত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, এবং এর সার্টিফিকেট বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য।
এই কোর্সের মোট টিউশন ফি হলো AUD 57,500। এর সাথে যদি প্রায় AUD 1,700 হেলথ ইন্সুরেন্স (OSHC) ধরি, তাহলে মোট প্রায় AUD 59,200। বাংলাদেশি টাকায় (১ AUD = ৮০ টাকা) হিসাব করলে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৪৮ লক্ষ টাকা।
ব্যক্তিগত খরচের ব্যাপারে বলতে গেলে — এটা আসলে ব্যক্তির জীবনধারা ও ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে। তবে গড়ে একজন স্টুডেন্টের সাপ্তাহিক খরচ কমপক্ষে AUD 300 ধরা যায়, যার মধ্যে বাসা ভাড়া, খাবার, যাতায়াত ইত্যাদি সব অন্তর্ভুক্ত। মানে, সপ্তাহে ৩০০ ডলার হলে মাসে ১,২০০ ডলার, এবং ২২ মাসে মোট খরচ হবে প্রায় AUD 26,400, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২১ লক্ষ টাকার মতো। অর্থাৎ, দুই বছরে টিউশন ফি এবং ব্যক্তিগত খরচ মিলিয়ে মোট খরচ প্রায় ৭০ লক্ষ টাকার মতো হতে পারে।
আরো একটি প্রশ্ন বেশিরভাগ স্টুডেন্টরা করে থাকে — “আমি কি কাজ করে আমার ব্যক্তিগত এক্সপেন্স আর টিউশন ফি চালাতে পারব?” এই প্রশ্নের উত্তরটা একটু কঠিন, বিশেষ করে এই কোর্সের ক্ষেত্রে। অস্ট্রেলিয়াতে অন্যান্য অনেক স্টুডেন্টদের হয়তো সপ্তাহে একদিন বা দুই সপ্তাহে একদিন ইউনিভার্সিটিতে যেতে হয়, কিন্তু Aviation Australia-র এই কোর্সে ৯০% attendance বাধ্যতামূলক, এবং প্রতিদিন সকাল ৭:৩০ থেকে দুপুর ২:৩০ পর্যন্ত ক্লাস চলে। যাতায়াতসহ দিনে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কেটে যায়। ক্লাসের পরিবেশ এমনভাবে সাজানো — মনে হবে যেন কোনো মিলিটারি ইন্সটিটিউট বা প্রাইমারি স্কুলের মতো ডিসিপ্লিনড জায়গায় পড়ছো। প্রতিটি নিয়ম খুব স্ট্রিক্টলি মেইনটেইন করা হয়। তাই ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরলে আসলে কাজ করার মতো সময় বা এনার্জি থাকে না।
সুতরাং যদি কেউ প্রশ্ন করে — “আমি কি কাজ করে আমার এক্সপেন্স আর টিউশন ফি দিতে পারব?” এক কথায় উত্তর: না, পুরোপুরি সম্ভব না। তবে আংশিকভাবে সম্ভব — মানে তুমি নিজের ব্যক্তিগত খরচের প্রায় ১০০% এবং টিউশন ফি’র প্রায় ৫০–৬০% পর্যন্ত নিজের আয়ে চালাতে পারবে। বাকি ৪০–৫০% বাড়ি থেকে নিতে হবে। অবশ্য যদি তুমি সত্যিই পরিশ্রমী হও, এবং সময় ম্যানেজ করতে পারো, তাহলে টিউশন ফি’র অর্ধেক পর্যন্ত নিজেই আর্ন করতে পারবে।
অস্ট্রেলিয়ার যেকোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে হলে সাধারণত অফিশিয়াল এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এজেন্সিগুলো প্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন পায়, তাই আবেদনের জন্য আলাদা করে এজেন্সিকে টাকা দিতে হয় না। শুধু সঠিক এজেন্সি বেছে নেওয়া জরুরি — যাদের ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে অফিসিয়াল পার্টনারশিপ আছে। যেমন, Aviation Australia-র জন্য বাংলাদেশে IDP Bangladesh অফিসিয়াল পার্টনার, তারা পুরো প্রসেসিং ফ্রি করে দেয়, কোনো অতিরিক্ত চার্জ নেয় না।
অফার লেটার পাওয়ার পর ভর্তি নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে দিতে হয় — ছয় হাজার (৬,০০০) ডলার টিউশন ফি এবং সতেরোশ (১,৭০০) ডলার স্বাস্থ্যবীমা, মোট সাত হাজার সাতশ (৭,৭০০) ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ছয় লক্ষ পনেরো হাজার টাকার মতো। এরপর ভিসা আবেদন ফি দিতে হয় দুই হাজার (২,০০০) ডলার, অর্থাৎ প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা।
ভিসা হয়ে গেলে টিকিটের খরচ সম্পূর্ণ আপনার উপর নির্ভর করবে। সাধারণত আশি হাজার থেকে দেড় লক্ষ টাকার মধ্যে একমুখী বিমান ভাড়া পড়ে। তবে কেউ চাইলে ভালো রুট বা বড় এয়ারলাইনের টিকিট নিলে খরচ আরও বাড়তে পারে। এর বাইরে নথিপত্র প্রস্তুত, মেডিকেল, পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ছবি, প্রিন্টিং ইত্যাদি আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে আরও পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টাকা লাগতে পারে। অস্ট্রেলিয়ান ভিসার জন্য আপনাকে আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে হবে। এই কোর্সের জন্য অন্তত পঞ্চাশ লক্ষ টাকা বা তার বেশি ব্যাংক ব্যালেন্স দেখানো প্রয়োজন। এই টাকা অন্তত তিন মাস ব্যাংকে থাকতে হবে, আর যদি ছয় মাস থাকে, তাহলে আপনাকে সোর্স অফ ফান্ড দেখাতে হয় না।
সব হিসাব মিলিয়ে বললে —আপনি যদি সত্যিই একজন আন্তর্জাতিক মানের এয়ারক্রাফট মেইনটেনেন্স ইঞ্জিনিয়ার হতে চান, তাহলে এভিয়েশন অস্ট্রেলিয়া খরচ বেশি হলে ও তুলনামূলক ভাবে ভালো অপসন।